নির্বাচন

রাষ্ট্রকে স্থিতিশীলতার পথে ফেরাতে এ মুহূর্তে জরুরি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর দেশে কার্যত কোনো নির্বাচনই অনুষ্ঠিত হয়নি। পরবর্তী সময়ে প্রহসনমূলক নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকার দফায় দফায় জনগণকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর দেশে কার্যত কোনো নির্বাচনই অনুষ্ঠিত হয়নি। পরবর্তী সময়ে প্রহসনমূলক নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকার দফায় দফায় জনগণকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। একটি অংশগ্রহণমূলক ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তার সহযোগী দলগুলো বছরের পর বছর রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে। অবশেষে বহু বছর ধরে জমে থাকা রাজনৈতিক ক্রোধ, ভোটাধিকারহীনতা, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও নাগরিক বঞ্চনার বিস্ফোরণ হয়েছে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে। গত বছরের ৫ আগস্ট স্বৈরাচারী শাসনের পতন ঘটে এবং তৎপরবর্তী সময়ে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। এ দুই ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে। একদিকে স্বৈরাচারের পতনে দেশজুড়ে স্বস্তি, অন্যদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে আশঙ্কা। ছাত্র-জনতার আন্দোলন সফল হয়েছে, বদলেছে স্বৈরাচারী শাসন ব্যবস্থা। তবে বাস্তবতা রয়ে গেছে একই জায়গায়। নিয়মিত দাঙ্গা-হাঙ্গামা, খুন-গুম, প্রকাশ্যে গুলি, ধর্ষণ, লুটপাট, জ্বালাও-পোড়াও; তার ওপর অর্থনৈতিক মন্দা, মুদ্রাস্ফীতি, আমদানি সংকট, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি ও কর্মসংস্থানের সংকীর্ণতা। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনমন ঘটেছে, রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী, শ্রমিক সবাই এক ধরনের অনিশ্চয়তায় বসবাস করছে। এ অনিশ্চয়তা কাটাতে এবং রাষ্ট্রকে স্থিতিশীলতার পথে ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ হতে পারে একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচন।

মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের প্রতিবেদন অনুযায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গত ১৪ মাসে মোট ৪০ জন মানুষ বিচারবহির্ভূতভাবে প্রাণ হারিয়েছেন। তাদের মধ্যে গুলিতে নিহত হয়েছেন ১৯ জন, নির্যাতনে মারা গেছেন ১৪ এবং সাতজনকে নিরাপত্তা বাহিনীর হেফাজতে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এ সময় গণপিটুনিতে মৃত্যু হয়েছে ১৫৩ জনের। রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৭ হাজার ৯৭৯টি। এছাড়া ধর্ষণ, চাঁদাবাজি ইত্যাদি চলছে অহরহ। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালের প্রথম দুই মাসে অন্তত ২৯৪ জন নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছেন,৷ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৯৬ জন, যার মধ্যে ৪৪ শিশুও রয়েছে। অর্থাৎ বছরজুড়ে কতশত নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে তা সহজেই অনুমেয়। এছাড়া মব জাস্টিস ও আগুন সন্ত্রাস কার্যক্রম চলছে দেদার। হাটবাজারের মতো জনবহুল এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা কার্যক্রমও চোখে পড়ার মতো। গণমাধ্যম ও বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনে উঠে আসা এসব অরাজকতা দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির গভীর সংকটের দিকটাই স্পষ্ট করে। এসব সন্ত্রাসমূলক ঘটনা একদিকে নাগরিকের আইনি নিরাপত্তাহীনতা বাড়িয়েছে, অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতিকেও আরো কঠিন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এ থেকে জনগণ প্রাণপণে মুক্তি চায়। তবে সেই মুক্তি কোথায় সেটাই বড় প্রশ্ন।

বলাবাহুল্য, গণতন্ত্রের একটি অন্যতম সৌন্দর্য হলো জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসা। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নয়, বরং রাষ্ট্র পরিচালনার নৈতিক বৈধতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎস। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা ও সমর্থনের ভিত্তি স্বয়ং জনগণই তৈরি করে। যখন সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা থাকে না, তখন রাজপথ হয়ে ওঠে শক্তি প্রদর্শনের একমাত্র মঞ্চ। কেউ দলীয় ক্ষমতা দেখাতে চায়, কেউ প্রতিশোধ নিতে চায়, কেউ এলাকাভিত্তিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়, আবার কেউ পেশিশক্তির বলে আইনের তোয়াক্কা না করে নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ার দুঃসাহস দেখায়। এ শূন্যতার ফাঁকেই জন্ম নেয় সহিংসতা। জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের ম্যান্ডেট নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু কার্যত সেই শাসন বেশিদিন জনগণের কল্যাণে নিবেদিত থাকতে পারেনি। অল্প সময়ের ব্যবধানেই শুরু হয়েছে অরাজক পরিস্থিতি। সরকার যেন এক ধরনের হাত গুটিয়ে নিয়েছে বলেই নাগরিক সমাজের ধারণা। কিন্তু নির্বাচিত সরকারের অধীনে এমন সুযোগ সীমিত। কেননা ক্ষমতাসীন সরকার পরবর্তী নির্বাচনের কথা চিন্তা করে জনকল্যাণে কাজ করে থাকে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে শক্ত হাতে অরাজকতা দমন করে। ফলে ক্ষমতার অপব্যবহার কমে, স্বজনপ্রীতি দমে এবং রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতাও বৃদ্ধি পায়।

বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একটি ভয়াবহ সংকট হলো অর্থনৈতিক সংকট। বলতে গেলে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা অর্থনীতির সবচেয়ে বড় শত্রু। দেশে প্রতিনিয়ত ছোট-বড় বহু ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হচ্ছে। এছাড়া বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যাংকে তারল্য সংকট, রিজার্ভ ঘাটতি, আমদানি-রফতানিতে ঝুঁকি ও মুদ্রাস্ফীতির চাপ ইত্যাদি জনজীবন দুর্বিষহ করে তুলছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আঙ্কটাডের ‘ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট-২০২৫’ অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০২৪ সালে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) আগের বছরের চেয়ে ১৩ শতাংশ কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে (জুলাই-মার্চ) নিট বিদেশী বিনিয়োগ কমেছে প্রায় ২৬ শতাংশ। আবার বাংলাদেশে বিনিয়োগের শীর্ষ উৎস দেশ যুক্তরাজ্য থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগের (এফডিআই) নিট প্রবাহ কমেছে ৪০ দশমিক ৭১ শতাংশ। এর পেছনে কারণগুলো হয়তো বহুমাত্রিক। তবে এটা স্পষ্ট যে নির্বাচিত সরকার ছাড়া কোনো বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। দেশীয় শিল্পোদ্যোক্তারাও রয়েছে নানা অনিশ্চয়তায়। সবচেয়ে বড় হতাশার ব্যাপার হলো অধিকাংশ বিদেশী বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এমনকি নির্বাচিত সরকার ছাড়া বিনিয়োগে ভরসা পাচ্ছে না বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের মিত্র দেশগুলোও।

অন্তর্বর্তী সরকার সীমিত সময়ের জন্য দায়িত্ব পেলেও তাদের হাতে সংস্কারের পরিকল্পনা ও ক্ষমতা সীমিত। বিগত সময়ে দেখা গেছে, কোনো সংস্কার করতে গেলেই হট্টগোল ও মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজ নিজ দাবি নিয়ে সরকারকে একপ্রকার বিপদে ফেলছে। প্রতিদিনই কোনো না কোনো দাবি উঠছেই। দাবি ঘিরে চলছে উত্তেজনা। আবার আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিচার ব্যবস্থাও যেন এক প্রকার ঝিমিয়ে পড়ছে অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও (টিআইবি) একাধিকবার উল্লেখ করেছে, গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকে সারা দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। খুন, ডাকাতি, চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ, আন্দোলনের নামে সহিংসতা, লুটপাট ও বিভিন্ন ধরনের অরাজকতা প্রতিনিয়ত ঘটছে। এতে নাগরিকদের দৈনন্দিন নিরাপত্তা চরমভাবে বিঘ্নিত এবং অপরাধ দমনে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ গভীরতর হচ্ছে।

জুলাই-আগস্ট আন্দোলন জাতিকে রাজনৈতিকভাবে জাগ্রত করেছে সত্য। তবে তা একই সঙ্গে ভেতরে ভেতরে বহু ক্ষতও তৈরি করেছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে ক্রমেই অবিশ্বাস বাড়ছে। সৃষ্টি হচ্ছে ভুল বোঝাবুঝি। ছোটখাটো বিষয়েও ব্যাপক অনৈক্য দেখা দিচ্ছে। দেশ যেন ক্রমেই এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান বাস্তবতায় তাই দ্রুততম সময়ে নির্বাচনের বিকল্প নেই। একটি শক্তিশালী নির্বাচিত সরকার সহজেই সব অরাজকতা দূরীকরণে কাজ করতে পারবে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়ন করতে পারবে। পক্ষান্তরে নির্বাচন বিলম্বিত হলে বিদ্যমান অস্থিরতা আরো বহুগুণে বাড়বে। অস্ত্রবাজি নিয়ন্ত্রণ কঠিন হবে। ধসে পড়বে অর্থনীতি, ভেঙে পড়বে বৈদেশিক আস্থা। প্রকারান্তরে অন্তর্বর্তী সরকার বৈধতার সংকটে পড়বে এবং দেশ দীর্ঘমেয়াদি অরাজকতার চক্রে আটকে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সামনে দুটি পথ খোলা। একদিকে অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক ধস, অন্যদিকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নতুন গণতান্ত্রিক যাত্রা। এ দুইয়ের মাঝে সেতুবন্ধ করতে একটি প্রক্রিয়া সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে। তা হলো দ্রুততম সময়ে একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রতিনিধির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর। বাংলাদেশকে স্থিতিশীলতার পথে ফিরিয়ে এনে অব্যাহত টেকসই উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আস্থা বজায় রাখতে জাতীয় নির্বাচন আর বিলম্ব করার কোনো সুযোগ নেই।

ড. মো. শামছুল আলম: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন (ভারপ্রাপ্ত)

আরও